পবিত্র যিলহজ্বের তাৎপর্য ও কুরবানীর গুরুত্বপূর্ন আমল


মুফতি মুস্তাফিজুর রহমান:আসমান-যমীনের সৃষ্টি অবধি মহান আল্লাহ বছরকে ১২ মাসে বিভক্ত করেছেন। এটি মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত।এর মধ্য থেকে মহান আল্লাহ চারটি মাসকে করেছেন সম্মানিত ও মহিমান্বিত।
 মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন- অর্থঃ
আল্লাহ যেদিন আসমান যমীন সৃষ্টি করেছেন সেদিন থেকেই মাসসমূহের গণনা আল্লাহ তাআলার নিকট তাঁর বিধান মতে ১২ টি। তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। -সূরা তাওবা (৯) : ৩৬

হাদীস শরীফে এসেছে-
নিশ্চয় সময়ের হিসাব যথাস্থানে ফিরে এসেছে, আসমান-যমীনের সৃষ্টির সময় যেমন ছিল (কারণ, আরবরা মাস-বছরের হিসাব কম-বেশি ও আগপিছ করে ফেলেছিল)। বার মাসে এক বছর । এর মধ্য থেকে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি মাস ধারাবাহিক- যিলকদ, যিলহজ্ব, মুহাররম। আরেকটি হল রজব, যা জুমাদাল আখিরাহ ও শাবানের মাঝের মাস। -সহীহ বুখারী, হাদীস নং৪৬৬২

যিলহজ্ব : সম্মানিত চার মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মাস

এ চার মাসের মধ্যে যিলহজ্ব মাসের ফযীলত সবচেয়ে বেশি। কারণ, এ মাসেই আদায় করা হয় ইসলামের অন্যতম প্রধান রোকন ও নিদর্শন হজ্ব এবং অপর নিদর্শন কুরবানীর মহান আমল ।
এ মাস আল্লাহর কাছে সম্মানিত। এতে রয়েছে এমন দশক, আল্লাহ তাআলা যার কসম করেছেন। বিদায় হজ্বের ভাষণে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ্ব মাসকে শ্রেষ্ঠ মাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
হযরত মুহাম্মদ সাঃ বলেছেন-
জেনে রাখো! সবচেয়ে সম্মানিত মাস হল, তোমাদের এ মাস (যিলহজ্ব)। -সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩৯৩১; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং১১৭৬২

এ মাস ইবরাহীম আঃ এর ন্যায় দৃড় ঈমান ও সমর্পণে উজ্জীবিত হওয়ার চেতনা অর্জনের মাস।
এ মাসে আমরা আদায় করি হজ্ব ও কুরবানী। আর এ দুই আমল ধারণ করে আছে ইবরাহীম আ.-এর ঈমান ও সমর্পণের বহু নজীর । শিরক ও মুশরিকদের থেকে চির বিচ্ছিন্নতা ঘোষণা এবং আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজ সন্তানকে কুরবানী করতে উদ্যত হওয়া এবং জনমাবহীন মরু প্রান্তরে স্ত্রী-সন্তানকে রেখে যাওয়ার কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া- এ সবই ছিল ইবরাহীম আ: এর দৃঢ় ঈমান ও নিঃশর্ত সমর্পণের বাস্তব প্রমাণ। তাইতো মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন- অর্থঃ
তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। যখন তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, তোমাদের সঙ্গে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ইবাদত কর তার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের (আকীদা-বিশ্বাস) অস্বীকার করি। আমাদের ও তোমাদের মাঝে চিরকালের জন্য শত্রæতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়ে গেছে। যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। -সূরা মুমতাহিনা (৬০) : ৪

এটাকেই বলে, ‘আলহুব্বু ফিল্লাহ ওয়াল বুগযু ফিল্লাহ’,-আল্লাহর জন্যই ভালবাসা স্থাপন, আল্লাহর জন্যই আবার বিচ্ছিন্ন হওয়া। ভালবাসা ও বিদ্বেষ পোষণের মানদন্ড হল ঈমান। এর মাধ্যমেই ঈমান পূর্ণতা পায়। হাদীস শরীফে এসেছে-
যে আল্লাহর জন্য (অন্যকে) ভালোবাসে, আল্লাহর জন্যই (কারো সাথে) বিদ্বেষ পোষণ করে, (কাউকে কিছু দিলে) আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যই দেয়, আর কাউকে কোনো কিছু দেওয়া থেকে বিরত থাকলে সেটাও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করে, সে স্বীয় ঈমানকে পূর্ণ করল। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং৪৬৮১

আর আল্লাহর হুকুমের সামনে নিজেকে পেশ করার যে আদর্শ ইবারাহীম আ. আমাদের জন্য রেখে গেছেন সে বিষয়েই পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- অর্থঃ
(স্মরণ করুন,) যখন ইবরাহীমের রব তাকে বললেন, আত্মসমর্পণ কর, সে বলল, জগৎসমূহের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করলাম। -সূরা বাকারা (২) : ১৩১
আর ইবরাহীম আ.-এর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল, আল্লহর হুকুমে নিজ সন্তানকে কুরবানী করতে উদ্যত হওয়া। এ পরীক্ষায় তিনি ও তাঁর সন্তান আল্লাহর ইচ্ছার সামনে নিজেদেরকে যে ভাবে পেশ করেছেন সেটিই কুরআনে হাকীমে এভাবে এসেছে- অর্থঃ
অতপর সে (ইসমাঈল) যখন তার পিতার সাথে কাজ করার মত বয়সে উপনীত হল তখন ইবরাহীম আঃ বললেন, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি। এখন তোমার অভিমত কী বল! সে বলল, হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। ইনশাআল্লাহ! আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন। অতপর যখন তারা (পিতাপুত্র) দুজনই (আল্লাহ তাআলার ইচ্ছার সামনে) আত্মসমর্পণ করলেন এবং ইবরাহীম আঃ তাকে কাত করে শুইয়ে দিল। তখন আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যই পালন করলে। নিশ্চয় আমি সৎকর্মশীলদেরকে এভাবেই পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটা ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে (ইসমাঈলকে) মুক্ত করলাম এক মহান কুরবানীর বিনিময়ে। -সূরা সাফফাত (৩৭) : ১০২-১০৭
আমাদের সব কিছুই একমাত্র আল্লাহর জন্য:
হাজ্বী সাহেবান দুনিয়ার সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এমনকি ইহরামের মাধ্যমে দৈনন্দিনের স্বাভাবিক পোশাকও বর্জন করে দুই প্রস্থ সেলাইবিহীন কাপড়ে ‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক-হাজির! বান্দা হাজির!!’ বলে নিজেকে আল্লাহর সমীপে পেশ করেন। সাদা পোশাকে, ধুলোধূসরিত বদনে আল্লাহর ঘরে হাজিরি দেয়।
 এ হাজিরি শুধু আল্লাহর জন্য, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। প্রতিনিয়ত তাদের যবান সতেজ থাকে লাব্বাইক, লাব্বাইক ধ্বনিতে-
আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির। আমি হাজির, আপনার কোনো শরীক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও নিআমত আপনারই এবং সকল ক্ষমতা আপনার। আপনার কোনো শরীক নেই।

তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিমগণ কুরবানী করেন। আল্লাহর হুকুমে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশে পশু কুরবানী করে। তখন এ দুআ পড়ে- নিশ্চয়
আমার নামাজ, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি এরই জন্য আদিষ্ট হয়েছি। এবং আমি মুসলিমদের একজন।

আল্লাহর দেওয়া সম্পদ ব্যয় করে মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কুরবানী করে। আবার সে পশুর গোস্ত আল্লাহ বান্দাকেই দান করেন ভক্ষণ করার জন্য। আর আল্লাহ চান বান্দার তাকওয়া, খালেস নিয়ত ও তাঁর হুকুমের সামনে সমর্পণ।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- অর্থঃ
আল্লাহর কাছে না পৌঁছে তাদের গোস্ত আর না তাদের রক্ত, বরং তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়াই পৌঁছে। -সূরা হজ্ব (২২) : ৩৭
এ সবকিছুই বান্দাকে স্মরণ করিয়ে দেয়- আমি আল্লাহর জন্য, আমার সবকিছু আল্লাহর জন্য।
এ মাস নেক আমলে অগ্রগামী হওয়ার মাস:
আল্লাহ তাআলা নিজ অনুগ্রহে বান্দাদের দান করেছেন ফযীলতপূর্ণ বিভিন্ন দিবস-রজনী। বছরের কোনো কোনো মাস, দিন বা রাতকে করেছেন ফযীলতপূর্ণ ও বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। যাতে এগুলোকে কাজে লাগিয়ে বান্দা ক্ষমা লাভ করতে পারে, নেক আমলে সমৃদ্ধ হতে পারে এবং আল্লাহর প্রিয় হতে পারে। এর মধ্যে যিলহজ্ব মাস অন্যতম প্রধান ফযীলতপূর্ণ মাস।

এ মাসের প্রথম দশককে মহান আল্লাহ করেছেন বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। এ দিনগুলোতেই হজ্বের মৌলিক আমল সম্পাদিত হয়। দশ যিলহজ্ব সারা বিশ্বের মুসলিমগণ কুরবানী করেন। এ দিনগুলোর নেক আমল আল্লাহ তাআলার নিকট অধিক প্রিয়।
হাদীস শরীফে এসেছে –
অর্থাৎ আল্লাহর নিকট যিলহজ্বের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও (এর চেয়ে উত্তম) নয়? তিনি বললেন, না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে হাঁ, সেই ব্যক্তির জিহাদ এর চেয়ে উত্তম, যে নিজের জান-মাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য বের হয়েছে। অতপর কোনো কিছু নিয়ে ঘরে ফিরে আসেনি। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং২৪৩৮; সহীহ বুখারী, হাদীস নং৯৬৯; জামে তিরমিযী, হাদীস নং৭৫৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং১৭২৭; মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং১৯৬৮

এ মাসের প্রধান আমল হচ্ছে হজ্ব:
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন- অর্থঃ
মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ গৃহের হজ্ব করা তার জন্য অবশ্যকর্তব্য। আর যে এই নির্দেশ পালন করতে অস্বীকার করবে তার জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ দুনিয়াবাসীদের প্রতি সামান্যও মুখাপেক্ষী নন। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ৯৭
সুতরাং যাদের উপর পবিত্র হজ্ব ফরয হয়েছে এবং তারা হজ্বে গিয়েছেন, তাদেরকে মোবারকবাদ; মহান
আল্লাহ তাদের হজ্বে মাবরুর নসীব করেন। কিন্তু যাদের উপর হজ্ব ফরয হওয়া সত্ত্বেও এখনও হজ্বে যাননি বা যাওয়ার নিয়ত করেননি আজই হজ্বের নিয়ত করুন।

লক্ষ্য করুন, উপরের আয়াতের শেষে মহান আল্লাহ কী বলেছেন-
আর যে এই নির্দেশ পালন করতে অস্বীকার করবে তার জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ দুনিয়াবাসীদের প্রতি সামান্যও মুখাপেক্ষী নন।
আরো শুনুন হযরত ওমর রা. কী বলেছেন। তিনি বলেছেন-
যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্ব করল না তার ইহুদী হয়ে মৃত্যুবরণ করা আর খ্রিস্টান হয়ে মৃত্যুবরণ করা সমান কথা। -তাফসীরে ইবনে কাসীর ২/৮৪ (সূরা আলে ইমরান ৯৭ নং আয়াতের অধীনে)
সুতরাং আর দেরি নয়; এখনই নিয়ত করুন ও আগামী বছর হজ্বে যাওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করুন। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
তোমরা দ্রততর সময়ের মধ্যে ফরয হজ্ব আদায় কর। কেননা তোমাদের কেউই একথা জানে না যে, আগামীতে তার ভাগ্যে কী আছে। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং২৮৬৭
তাছাড়া কেন আমি নিজেকে হজ্বের এ ফযীলতসমূহ থেকে বঞ্চিত করব? হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
যে ব্যক্তি একমাত্র অল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্ব করে এবং কোনো অশ্লীল কাজ বা গুনাহে লিপ্ত হয় না, সে সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে বাড়ী ফেরে। -সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫২১
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন-
মাবরুর (মকবুল) হজ্বের প্রতিদান জান্নাত। -সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৭৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং১৩৪৯
তালবিয়া : এ ধ্বনির মিছিলে আমিও শামিল
আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির। আমি হাজির, আপনার কোনো শরীক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা ও নিআমত আপনারই এবং সকল রাজত্ব আপনার। আপনার কোনো শরীক নেই।

সাদা লেবাসের মানুষগুলোর মুখে প্রতিনিয়ত উচ্চারিত হয় এ ধ্বনি। তারা মক্কার প্রতিটি অলি-গলি সজিব সতেজ করে তুলেন এ ধ্বনিতে। এটি বায়তুল্লাহ্য় উপস্থিত হয়ে বাইতুল্লাহর রবের সমীপে হাজিরী ও সমর্পণের ঘোষণা। এ শুধু হজ্ব ও হাজ্বীর ধ্বনি নয়, এ ধ্বনি সারা বিশ্বের প্রতিটি মুমিন মুসলমানের। এ শুধু হজ্ব ও হাজ্বীর ঘোষণা নয়, এ ঘোষণা সারা বিশ্বের প্রতিটি মুমিনের, প্রতিটি মুসলিমের।
নিজেকে এবং নিজের সব কিছুকে আল্লাহ তাআলার হাওয়ালা করে দেওয়ার ঘোষণা। তালবিয়ার মাধ্যমে বান্দা নিজেকে আল্লাহর সমীপে পেশ করে এবং সমর্পিত হয় তাঁর সামনে। এটিই তালবিয়ার মর্মবাণী। আর এ শুধু হাজ্বীর কর্তব্য নয়, সকল মুমিনের কর্তব্য; শুধু হজ্ব মওসুমের কর্তব্য নয়, সারা জীবনের কর্তব্য।

এ মাসের অনন্য আমল হাজ্বীদের খেদমত:
হাজ্বীগণের খেদমত বড় সৌভাগ্যের আমল। কারণ, হাজ্বীগণ হলেন আল্লাহর মেহমান, আমাদের পক্ষ থেকে আল্লাহর ঘরের উদ্দেশে প্রেরিত প্রতিনিধি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
অর্থাৎ আল্লাহর রাহে (ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে) জিহাদকারী, হজ্ব ও উমরা আদায়কারী- এরা আল্লাহর ওয়াফ্দ (মেহমান)। আল্লাহ তাদের ডেকেছেন আর তারা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছেন। তারা আল্লাহর কাছে চেয়েছেন আর আল্লাহ তাদের দিয়েছেন। -সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং ৪৬১৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং২৮৯৩
 সরকার যত বড় হয় তার মেহমানের মর্যাদা তত বেশি হয়। এরপর যদি সে হয় সরকারের পক্ষ থেকে দাওয়াতপ্রাপ্ত। তাহলে তো কথাই নেই! ‘ওয়াফ্দ’-এর মাঝে এ বিষয়টিও থাকে যে, তারা দরবারে গিয়ে নিজ কওমের পক্ষ থেকে প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেন। এ বিষয়টিই একটি হাদীসে এসেছে-
অর্থাৎ, হাজ্বী আল্লাহর মেহমান। এবং নিজের ‘আহলের’ পক্ষ থেকে প্রতিনিধি। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং১২৬৫৯
সুতরাং যিলহজ্বের আমলের মধ্যে আল্লাহর মেহমান-হাজ্বীদের খেদমতকে আমরা সৌভাগ্য মনে করি। আর হাজ্বীদের (যমযম পান করানোর) খেদমতকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আমালুন ছালিহুন-নেক আমল’ বলেছেন। এমনকি নিজেও উক্ত খেদমতে শরীক হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীস-
অতপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যমযমের কাছে আসলেন। দেখলেন, লোকেরা হাজ্বীদের যমযম পান করানোর খেদমতে নিয়োজিত। এ দেখে তিনি বললেন, তোমরা তোমাদের কাজে ব্যস্ত থাকো; কারণ, তোমরা নেক কাজের মধ্যে রয়েছ। যদি এ কাজে আমার উপস্থিতির কারণে লোকদের ভিড় বেড়ে গিয়ে তোমাদের কাজে ব্যাঘাৎ হওয়ার আশংকা না হত তাহলে আমি কূপ থেকে পানি তোলার রশি এখানে চড়িয়ে নিতাম, অর্থাৎ নিজ কাঁধে উঠিয়ে নিতাম। -সহীহ বুখারী, হাদীস নং১৬৩৫
আর যাদের হজ্বে যাওয়ার সুযোগ হয়নি তারা আরো বেশি করে হজ্বগামীদের খেদমত করি। কারণ, হতে পারে এর ওসিলায় আল্লাহ আমাকেও সেখানে নিয়ে যাবেন, হজ্বের তাওফীক দান করবেন।

মহান আল্লাহ কসম করেছেন যে দশ রাতের:
আমরা জেনেছি, যিলহজ্ব মাস আশহুরে হুরুম তথা সম্মানিত চার মাসের অন্যতম প্রধান মাস। আবার এ মাসের মধ্যে প্রথম দশক হল প্রধান। এ দশক এতটাই ফযীলতপূর্ণ ও মহিমান্বিত যে, আল্লাহ তাআলা এ দশ রাতের কসম করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- অর্থঃ
শপথ ফযরের, শপথ দশ রাত্রির। -সূরা ফাজ্র (৮৯) :১-২
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ও মুজাহিদ রাহ.-সহ অনেক সাহাবী, তাবেঈ ও মুফাসসির বলেন, এখানে ‘দশ রাত্রি’ দ্বারা যিলহজ্বের প্রথম দশ রাতকেই বুঝানো হয়েছে। -তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/৫৩৫
এ দশককে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দিন বলা হয়েছে। হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
দুনিয়ার সর্বোত্তম দিনগুলো হল, যিলহজ্বের দশদিন। জিজ্ঞাসা করা হল, আল্লাহর রাস্তায়ও কি তার সমতুল্য নেই? তিনি বললেন, আল্লাহর রাস্তায়ও তার সমতুল্য নেই। তবে ঐ ব্যক্তি, যার চেহারা ধূলিযুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ শাহাদাত লাভ করেছে। -মুসনাদে বাযযার, হাদীস নং১১২৮; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদীস নং ২০১০; মাজমাউল যাওয়াইদ ।
গুনাহ করে এ মূল্যবান দিন গুলির সম্মান নষ্ট না করি:
মুমিন তো আল্লাহর দেওয়া বিভিন্ন সুযোগকে গনীমত মনে করে কাজে লাগায়। এসকল ফযীলতপূর্ণ মওসুমে নেক আমলের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করে তার আমলের খাতা। কিন্তু কখনো কখনো কারো দ্বারা এমন হয়ে যেতে পারে যে, নেক আমলের তো তাওফীক হল না; কিন্তু গুনাহের কালিমায় কলুষিত হল আমলনামা। এমনটি কখনোই কাম্য নয়। এক কবি বলেছেন-
নেক আমল করতে যদি নাও পার,
গুনাহে লিপ্ত হয়ো না।
নেক আমল যতটুকু করতে পারি-না পারি; গুনাহের মাধ্যমে যেন এ সম্মানিত দিনগুলোর অসম্মান না করি। এর মাধ্যমে তো আমি নিজেকেই অসম্মানিত করছি।
ইবনে রজব হাম্বলী রাহ. লাতাইফুল মাআরিফে যিলহজ্বের আলোচনায় বলেন-
রহমতের মওসুমসমূহে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো। কেননা তা ক্ষমা থেকে বঞ্চিত করে। -লাতায়েফুল মাআরেফ, পৃ. ৩৭৯
আর যে আয়াতে আল্লাহ তাআলা চারটি মাসকে সম্মানিত ঘোষণা করেছেন সে আয়াতের শেষে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- অর্থঃ
(…তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত) …সুতরাং এ মাসসমূহে তোমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করো না। -সূরা তাওবা (৯) : ৩৬
আল্লাহর নাফরমানী নিজের উপর সবচেয়ে বড় যুলুম। কারণ, এর ক্ষতি তো নিজের উপরই । সুতরাং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এ মাসের প্রথম কাজ, সাথে সাথে নেক আমলের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া জরুরী।

এ দশকে বেশী বেশী নেক আমল করা চাই:
এখন আমরা কীভাবে এ দশকের হক আদায় করতে পারব এবং এর ফযীলত লাভ করতে পারব? হাদীস শরীফে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এ দশকের হক আদায়ের পথ ও পদ্ধতি শিখিয়েছেন। এর ফযীলত ঘোষণার মাধ্যমে উৎসাহিত করেছেন আমলের প্রতি। সুতরাং হাদীস শরীফে বর্ণিত আমলের মাধ্যমেই আমরা এ দশকের হক আদায় করতে পারি। আসুন আমরা জেনে নিই এ দশকের কী কী আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে ।

যিকিরুল্লাহর ধ্বনিতে প্রাণবন্ত করি :
যিকির আল্লাহ তাআলার কাছে অনেক প্রিয় আমল। এ দশকের আমল হিসেবে বিশেষভাবে যিকিরের কথা এসেছে। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
আল্লাহ তাআলার নিকট আশারায়ে যিলহজ্বের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সুতরাং তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং আলহামদু লিল্লাহ পড়। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং৫৪৪৬; আদদাআওয়াতুল কাবীর, তবারানী, হাদীস নং৫৩৪
এছাড়া যিলহজ্বের এ দশকের বিভিন্ন আমলও প্রাণবন্ত থাকে আল্লাহর যিকিরে। হাজ্বীগণ ইহরাম বাঁধার পর থেকে উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে তালবিয়ার মাধ্যমে স্মরণ করতে থাকেন আল্লাহকে। জামরায় কংকর নিক্ষেপের সময়ও বলেন- আল্লাহু আকবার। সারা বিশ্বের মুসলিমগণ আইয়ামে তাশরীকে ফরয নামাযের পর তাকবীরে তাশরীকের মাধ্যমে আল্লাহর যিকির করেন। কুরবানীর দিন কুরবানী করার সময় বলেন- বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার। এমনকি হজ্বের আমলসমূহের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
নিশ্চয়ই বাইতুল্লাহর তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সায়ী এবং জামারাতে কংকর (পাথর)নিক্ষেপের আমল বিধিবদ্ধ করাই হয়েছে আল্লাহর যিকিরের জন্য। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং১৮৮৮; জামে তিরমিযী, হাদীস নং৯০২
মোটকথা, যিলহজ্বের এ দিনগুলো যেন প্রাণবন্ত থাকে আল্লাহর যিকিরে।

যিলহজ্ব শুরু হলে ফযীলত লাভে নখ-চুল না কাটি:
ইহরাম করার পর হাজ্বী সাহেবদের জন্য নখ-চুল কাটাসহ আরো কিছু বিষয় নিষেধ। কিন্তু যারা হজ্বে যাননি তাদের জন্য এ নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে যিলহজ্বের প্রথম দশকে নখ-চুল না কাটার মাধ্যমে অন্যরাও সাদৃশ্য অবলম্বন করতে পারে হাজ্বী সাহেবদের সাথে এবং লাভ করতে পারে বিশেষ ফযীলত। হাদীস শরীফে এ আমলের ফযীলত বর্ণিত হয়েছে-
উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন যিলহজ্বের দশক শুরু হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে কুরবানী করবে সে যেন তার চুল নখ না কাটে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস নং১৯৭৭; জামে তিরমিযী, হাদীস নং১৫২৩

এই হাদীসের উপর ভিত্তি করে ফকীহগণ কুরবানীকারীর জন্য নখ-চুল না কাটাকে মুস্তাহাব বলেছেন। তাই যিলকদ মাসেই চুল-নখ কেটে যিলহজ্বের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা চাই। যাতে তা বেশি লম্বা হয়ে না যায়, যা সুন্নতের খেলাফ।
আর যে ব্যক্তি কুরবানী করবে না তার জন্য এ হুকুম প্রযোজ্য কি না- এ ব্যাপারে কেউ কেউ বলেছেন, এ হুকুম কেবলমাত্র কুরবানীকারীদের জন্য প্রযোজ্য। তাদের দলীল পূর্বোক্ত হাদীস। আর কেউ কেউ বলেন, কুরবানী যারা করবে না তাদের জন্যও এ আমল রয়েছে। আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত-
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে কুরবানীর দিবসে ঈদ (পালনের) আদেশ করা হয়েছে, যা আল্লাহ এ উম্মতের জন্য নির্ধারণ করেছেন। এক সাহাবী আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি আমার কাছে শুধু একটি মানীহা থাকে (অর্থাৎ অন্যের থেকে নেওয়া দুগ্ধ দানকারী উটনী) আমি কি তা কুরবানী করব? নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, তবে তুমি চুল, নখ ও মোঁচ কাটবে এবং নাভীর নিচের পশম পরিষ্কার করবে। এটাই আল্লাহর দরবারে তোমার পূর্ণ কুরবানী বলে গণ্য হবে। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং২৭৮৯; সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং৪৩৬৫
এই হাদীসে যেহেতু কুরবানীর দিন চুল-নখ কাটার কথা আছে তাহলে এর আগে না কাটার দিকে ইঙ্গিত বুঝা যায়।
২. ওলীদ বিন মুসলিম বলেন, আমি মুহাম্মাদ বিন আজলানকে যিলহজ্বের দশকে চুল কাটা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন, আমাকে নাফে রাহ. বলেছেন-
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. এক নারীর নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। মহিলাটি যিলহজ্বের দশকের ভেতর তার সন্তানের চুল কেটে দিচ্ছিল। তখন তিনি বললেন, যদি ঈদের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে তবে বড় ভাল হত। -মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস নং৭৫২০
৩. এ সম্পর্কে আরেকটি বর্ণনা হল-
মুতামির ইবনে সুলাইমান আততাইমী বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, ইবনে সীরীন রাহ. যিলহজ্বের দশকে চুল কাটা অপছন্দ করতেন। এমনকি এই দশকে ছোট বাচ্চাদের মাথা মুন্ডন করাকেও অপছন্দ করতেন। -আল মুহাল্লা, ইবনে হাযম ৬/২৮

এসব দলীলের কারণে কারো কারো মতে সকলের জন্যই যিলহজ্বে প্রথম দশকে নখ, গোঁফ ও চুল না-কাটা উত্তম। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই, এ বিধানটি কুরবানীদাতার জন্য তাকিদপূর্ণ।

যিলহজ্বের প্রথম নয় দিন রোযা রাখতে পারি:
অধিকাংশ ফকীহগণ এই নয় দিন রোযা রাখা উত্তম বলেছেন। কারো পক্ষে সম্ভব হলে সে পুরো নয় দিনই রোযা রাখল। কারণ, যিলহজ্বের পুরো দশকের আমলই আল্লাহর কাছে প্রিয়। এ দশককে আমলে প্রাণবন্ত রাখার জন্য রোযার বিকল্প কোনো আমল নেই। কারণ, রোযা আল্লাহর কাছে অত্যধিক প্রিয় আমল। সুতরাং আমাদের যাদের জন্য সম্ভব যিলহজ্বের প্রথম দশক তথা নয় যিলহজ্ব পর্যন্ত রোযা রাখতে চেষ্টা করি।
 হাদীস শরীফে এসেছে-
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ্বের নয়টি দিবস রোযা রাখতেন। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৪৩৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২২৩৩৪; সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদীস ৮৩৯৩
হযরত হাফসা রা. থেকে বর্ণিত আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন-
চারটি আমল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো ছাড়তেন না। আশুরার রোযা, যিলহজ্বের প্রথম দশকের রোযা, প্রত্যেক মাসের তিন দিনের রোযা, ফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নত নামায। -সুনানে নাসায়ী, হাদীস ২৪১৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৬৪২২; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদীস ৭০৪২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৬৩৩৯

ফজীলত লাভে ৯ যিলহজ্বে রোযা রাখি:
কারো পক্ষে যদি পুরো নয় দিনই রোযা রাখা সম্ভব হয় তাহলে তো সোনায় সোহাগা। কিন্তু পুরো নয় দিন যদি সম্ভব না হয়, নয় যিলহজ্বের রোযার ফযীলত থেকে যেন কেউ বঞ্চিত না হয়। কারণ, এ দিনের রোযার ফযীলত সম্পর্কে আবু কাতাদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
আরাফার দিনের (নয় যিলহজ্বের) রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা করি যে, (এর দ্বারা) আগের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিবেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস নং১১৬২
প্রকাশ থাকে যে, উক্ত হাদীসে বর্ণিত ইয়াওমে আরাফা দ্বারা যিলহজ্বের নয় তারিখ উদ্দেশ্য। এই তারিখের পারিভাষিক নাম হচ্ছে ইয়াওমে আরাফা। কেননা এই রোযা আরাফার ময়দানের আমল নয় বরং আরাফার দিন তো হাজ্বীদের জন্য রোযা না রাখাই মুস্তাহাব। হাদীস শরীফে এসেছে-
উম্মুল ফযল বিনতে হারেছ বলেন, তারা কতক লোক ইয়াওমে আরাফায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রোযার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করছিল। কেউ কেউ বলছিল, তিনি রোযা আছেন। আর কেউ কেউ বলছিল, তিনি রোযা নেই। উম্মুল ফযল একটি পেয়ালাতে দুধ পাঠালেন। নবীজী তখন উটের উপর ছিলেন। তিনি দুধ পান করলেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস নং১১২৩
আরাফার দিন আল্লাহর রাসূল রোযা রাখেননি। একারণে ফকীহগণ হাজ্বীদের জন্য আরাফার দিন রোযা না রাখা উত্তম বলেছেন। আবু কাতাদা রা.-এর হাদীস দ্বারা ইয়াওমে আরাফায় রোযা রাখা মুস্তাহাব প্রমাণিত হয়। সুতরাং বুঝা গেল, আবু কাতাদাহ রা.-এর হাদীসে ‘ইয়াওমে আরাফা’ দ্বারা নয় যিলহজ্ব অর্থাৎ ঈদের আগের দিনই উদ্দেশ্য। সুতরাং আমাদের দেশের চাঁদের হিসেবে যেদিন নয় তারিখ হয় সেদিনই রোযা রাখা হবে। সৌদির হিসাবে আরাফার দিন অনুযায়ী নয়। উল্লেখ্য, তাকবীরে তাশরীক সংক্রান্ত হাদীসেও ইয়াওমে আরাফা দ্বারা নয় যিলহজ্বই উদ্দেশ্য। কেননা এ আমলও আরাফার সাথে নির্দিষ্ট কোনো আমল নয়।

আরাফার গুরুত্ব ও ফযীলত:
এ দিন আল্লাহর কাছে অনেক মহিমান্বিত। এদিনেই আল্লাহ তাআলা এ দ্বীনকে পূর্ণতা দানের ঘোষণা দিয়েছেন এবং বান্দাদের প্রতি তাঁর নিআমতকে পূর্ণ করেছেন। এদিনেই হজ্বের মূল আমল উকূফে আরাফা। কুরআনে কারীমে আল্লাহ এ দিনের কসম করেছেন। এ দিনের দুআ আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ দুআ। এ দিনের রোযার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার দুই বছরের গুনাহ মাফ করেন। এদিন আল্লাহ সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন।

ইয়াওমে আরাফায় নাযিল কৃত আয়াত:
আরাফার দিনেই ঐ আয়াত নাযিল হয়েছে, যে আয়াতে আল্লাহ তাআলা এ দ্বীনের পূর্ণতাদানের ঘোষণা দিয়েছেন। তারেক ইবনে শিহাব বর্ণনা করেন, এক ইহুদী ওমর ইবনে খাত্তাব রা. কাছে এল এবং বলল-
হে আমীরুল মুমিনীন! আপনাদের কিতাবে (কুরআনে) একটি আয়াত রয়েছে, উক্ত আয়াত যদি আমরা ইহুদীদের উপর নাযিল হত তাহলে আমরা ঐ দিনকে ঈদের দিন হিসেবে গ্রহণ করতাম। ওমর রা. জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ আয়াত? সে তখন বলল-
[আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিআমত পরিপূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম। -সূরা মায়েদা (৫) : ৩]

হযরত ওমর রা. উত্তরে বলেন
আমি খুব ভালো করে জানি, এ আয়াত কবে নাযিল হয়েছে, কোথায় নাযিল হয়েছে। এ আয়াত নাযিল হয়েছে এক জুমার দিন, আরাফায় (আশিয়্যাতা আরাফা-আরাফার বিকেলে)। -সহীহ মুসলিম, হাদীস নং৩০১৭; সহীহ বুখারী, হাদীস নং৪৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং১৮৮

আরাফার দিনে
বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় :
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
আরাফার দিনের মত আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার নিকটবর্তী হন এবং বান্দাদের নিয়ে ফিরিশতাদের সাথে গর্ব করেন। আল্লাহ বলেন, কী চায় তারা? -সহীহ মুসলিম, হাদীস নং১৩৪৮
জাবের রা. থেকে বর্ণিত আরেক বর্ণনায় রয়েছে-
আল্লাহ তাআলা নিকটতম আসমানে আসেন এবং পৃথিবীবাসীকে নিয়ে আসামেনর অধিবাসী অর্থাৎ ফিরিশতাদের সাথে গর্ব করেন। বলেন, দেখ তোমরা- আমার বান্দারা উস্কোখুস্কো চুলে, ধুলোয় মলিন বদনে, রোদে পুড়ে দূর-দূরান্ত থেকে এখানে সমবেত হয়েছে। তারা আমার রহমতের প্রত্যাশী। অথচ তারা আমার আযাব দেখেনি। ফলে আরাফার দিনের মত আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। -সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস #

আইয়ামে তাশরীক :
এ দিনগুলো পানাহার ও তাকবীরের জন্য-
যিলহজ্ব মাসের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখকে পরিভাষায় আইয়ামে তাশরীক বলে। আইয়ামে তাশরীক-এর অন্যতম প্রধান আমল হল, আল্লাহর যিকির-তাকবীর।

হাজ্বীগণ জামারাতে কংকর নিক্ষেপের সময় বলেন- আল্লাহু আকবার। কুরবানীদাতাগণ কুরবানী করার সময় বলেন- বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার। প্রতি ফরয নামাযের পর হাজ্বীগণসহ সারা বিশ্বের মুসলিম তাকবীরে তাশরীক বলে। এভাবে যিকির-তাকবীরে জীবন্ত থাকে আইয়ামে তাশরীক। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- অর্থঃ
তোমরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ কর। -সূরা বাকারা (২) : ২০৩
ইবনে আব্বাস রা. বলেন, এখানে উদ্দেশ্য- আইয়ামে তাশরীক। (দ্র. সহীহ বুখারী, বাবু ফাদলিল আমাল ফী আইয়ামিত তাশরীক; মারিফাতুস সুনানি ওয়াল আছার, হাদীস নং১০৮৭২)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফরমান-
আইয়ামে তাশরীক পানাহার ও আল্লাহর যিকিরের জন্য। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২০৭২২

এই দিনগুলোতে সাহাবায়ে কেরাম সর্বদা আল্লাহু আকবারের ধ্বনি তুলতেন। হযরত ইবনে উমর রা. ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বাজারে গিয়ে তাকবীরের আওয়াজ তুলতেন। শুনে শুনে লোকেরাও তাদের সাথে তাকবীরের সুর তুলত। ইবনে ওমর রা. পথে-ঘাটে, হাঁটা-বসায়, বাজারে-ঘরে এবং নামাযের পরে তাকবীর বলতে থাকতেন। মিনার দিনগুলো তো তাঁর তাকবীরের সাথে সমস্বরে মানুষের তাকবীরে মিনার পুরো অঙ্গন মুখরিত হয়ে উঠত। মহিলারাও (নিচু স্বরে) তাকবীর বলতে থাকতেন। -সহীহ বুখারী-ফাতহুল বারী ২/৫৩০-৫৩৬
সার্বক্ষণিক যিকির ও তাকবীরের আমল ছাড়াও আশারায়ে যিলহজ্ব ও আইয়ামে তাশরীক-এই তের দিনের প্রায় প্রতিটি ইবাদত ও আমলের সাথে যিকির ও তাকবীরকে এমনভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেন সব আমল-ইবাদতের মূল কথা হল যিকরুল্লাহ, তাকবীর ও তাওহীদ।

তাকবীরে তাশরীক :
তালবিয়া উচ্চারিত হচ্ছে হাজ্বীগণের মুখে, শুধু মক্কায়। কুরবানীদাতার মুখে- বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার। কিন্তু তাকবীরে তাশরীক এমন এক যিকির, যা দ্বারা গুঞ্জরিত হয় মক্কাসহ পৃথিবীর প্রতিটি জনপদ। এ যিকির উচ্চারিত হয়, প্রতিটি মসজিদে, প্রতিটি মুসলিমের ঘরে; প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের পর, নারী-পুরুষ সকলের মুখে। তাকবীরে তাশরীকের পুরো বাক্যজুড়ে রয়েছে তাওহীদ, আল্লাহর বড়ত্ব ও প্রশংসা-

৯ যিলহজ্ব ফজর হতে ১৩ যিলহজ্ব আসর পর্যন্ত মোট তেইশ ওয়াক্তের নামাযের পর একবার করে তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব। জামাতে নামায পড়া হোক বা একাকি, পুরুষ বা নারী, মুকীম বা মুসাফির সকলের উপর ওয়াজিব। এমনকি ৯ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত কোনো নামায কাযা হয়ে গেলে এবং ঐ কাযা এই দিনগুলোর ভিতরেই আদায় করলে সে কাযা নামাযের পরও তাকবীরে তাশরীক পড়বে। পুরুষগণ তাকবীর বলবে উচ্চ আওয়াজে আর নারীগণ নিচুস্বরে।

ইয়াওমুন নাহার : সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত দিন এটি
দশ যিলহজ্ব ইয়াওমুন নাহর-কুরাবানীর দিন। এ দিন হাজ্বী সাহেবান মিনায় কুরবানী করেন আর সারা বিশ্বের মুসলিমগণ নিজ নিজ দেশে কুরবানী করেন। এ দিনকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত দিন বলেছেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে কুরত রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন ইয়াওমুন নাহর-দশ যিলহজ্ব। তারপর ইয়াওমুল কার-এগার যিলহজ্ব; যেদিন মানুষ মিনায় অবস্থান করে। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং১৭৬৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৯০৭৫
বিদায় হজ্বে ইয়াওমুন নাহরের ভাষণে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
জেনে রাখো, তোমাদের এ দিন (ইয়াওমুন নাহর) সবচেয়ে সম্মানিত দিন। -সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং৩৯৩১; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং১১৭৬২

এ দিন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
আমাকে ‘ইয়াওমুল আযহা’র আদেশ করা হয়েছে (অর্থাৎ, এ দিবসে কুরবানী করার আদেশ করা হয়েছে); এ দিবসকে আল্লাহ তাআলা এ উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৬৫৭৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং৫৯১৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং২৭৮৯; সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং৪৩৬৫

পবিত্র ঈদুল আযহায় সুন্নত ও আদব:

ঈদুল আযহার দিন ঈদের নামাযের পরে খাব এমন করাই মুস্তাহাব। সহজে সম্ভব হলে এ মুস্তাহাব আমলের প্রতি লক্ষ্য রাখাই ভালো।
আব্দুল্লাহ ইবনে বুরাইদা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন-
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন কোনো কিছু না খেয়ে ঈদগাহে যেতেন না। আর ঈদুল আযহার দিন নামায না পড়ে কিছু খেতেন না। -জামে তিরমিযী, হাদীস নং৫৪২
কোনো বর্ণনায় আছে-
আর কুরবানী ঈদের দিন যবেহ করার আগে কিছু খেতেন না। -সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস নং১৪২৬; সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদীস নং৬১৫৯; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং২৩০৪২
কোনো কোনো বর্ণনায় আছে-
আর ঈদুল আযহার দিন ঈদগাহ থেকে ফেরার আগে কিছু খেতেন না; (কুরবানীর পশু যবেহ হওয়ার পর) নিজ কুরবানীর পশুর গোস্ত থেকে খেতেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং২২৯৮৪; সুনানে দারাকুতনী, হাদীস নং১৭১৫; মারিফাতুস সুনানি ওয়াল আসার, হাদীস নং৬৮৪৬
স-শব্দে তাকবীর বলতে বলতে ঈদগাহে যাব:
নাফে রাহ. ইবনে ওমর রা.-এর আমল বর্ণনা করেন-
ইবনে ওমর রা. ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের সকালে সশব্দে তাকবীর বলতে বলতে ঈদগাহে যেতেন এবং ইমাম আসা পর্যন্ত তাকবীর বলতে থাকতেন। -সুনানে দারাকুতনী, বর্ণনা ১৭১৬; সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদীস নং৬১২৯

ঈদের নামাযের পর কুরবানী করব:
বারা ইবনে আযিব রা. বলেন-
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের উদ্দেশে খুতবা দিলেন। তাতে বললেন, আমাদের এই দিবসে প্রথম কাজ নামায আদায় করা, এরপর কুরবানী করা। সুতরাং যে এভাবে করবে তার কাজ আমাদের তরীকা মতো হবে। আর যে আগেই যবেহ করেছে (তার কাজ তরীকা মতো হয়নি অতএব) তা পরিবারের জন্য প্রস্তুতকৃত গোশত, (আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত) কুরবানী নয়। -সহীহ বুখারী, হাদীস নং৯৬৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং১৯৬১; সহীহ ইবনে হিব্বান ৫৯০৭
ঈদের দিন একে অপরের সাথে দেখা হলে কি বলব…
জুবায়ের ইবনে নুফাইর রাহ.
সাহাবায়ে কেরামগণ ঈদের দিন পরস্পর সাক্ষাৎ হলে বলতেন-
"তাকব্বালাল্লাহুমিন্না ওয়ামিনকা"
 অর্থঃ- আল্লাহ কবুল করুন আমাদের পক্ষ হতে ও আপনার পক্ষ হতে। -ফাতহুল বারী ২/৫১৭

যবেহের সময় দুআ পড়তে হবে
হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত-
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন দু’টি সাদা-কালো, বড় শিং বিশিষ্ট, খাসি দুম্বা যবেহ করেছেন। যখন তিনি তাদের শায়িত করলেন তখন তিনি দোয়া পড়লেনএরপর যবেহ করলেন।
 -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং২৭৯৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং১৫০২২; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস নং১৭১৬
সুতরাং কুরবানীর জন্তু যবেহ-এর সময় দু'আর আমল করব।

অহেতুক কষ্ট দেয়া ছাড়া সুন্দরভাবে যবেহ করব
হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওছ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
আল্লাহ তাআলা সকল কিছুর উপর অনুগ্রহকে অপরিহার্য করেছেন। অতএব যখন তোমরা হত্যা করবে তো উত্তম পদ্ধতিতে হত্যা কর। যখন যবেহ করবে তো উত্তম পদ্ধতিতে যবেহ কর। প্রত্যেকে তার ছুরিতে শান দিবে এবং তার পশুকে শান্তি দিবে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস নং১৯৫৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং২৮১৫; সুনানে নাসায়ী, হাদীস নং৪৪০৫; জামে তিরমিযী, হাদীস নং১৪০৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩১৭০

কুরবানীর পশুর গোশত : নিজে খাব অন্যদের খাওয়াব
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- অর্থঃ
কুরবানীর উট (ও গরু)কে তোমাদের জন্য আল্লাহর ‘শাআইর’ (নিদর্শনাবলি)-এর অন্তর্ভুক্ত করেছি। তোমাদের জন্য তাতে রয়েছে কল্যাণ। সুতরাং যখন তা সারিবদ্ধ অবস্থায় দাঁড়ানো থাকে, তোমরা তার উপর আল্লাহর নাম নাও। তারপর যখন (যবেহ হয়ে যাওয়ার পর) তা কাত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়, তখন তার গোশত হতে নিজেরাও খাও এবং ধৈর্যশীল অভাবগ্রস্তকেও খাওয়াও, এবং তাকেও, যে নিজ অভাব প্রকাশ করে। এভাবেই আমি এসব পশুকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। -সূরা হজ্ব (২২) : ৩৬
হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত-
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (বিশেষ একটি কারণে) তিন রাত পর কুরবানীর গোশত খেতে নিষেধ করেছিলেন। এরপর (অবকাশ দিয়ে) বলেন, ‘খাও, পাথেয় হিসাবে সঙ্গে নাও এবং সংরক্ষণ করে রাখ’। -সহীহ মুসলিম, হাদীস নং১৯৭২
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর এক বর্ণনায় আছে-
‘খাও, সংরক্ষণ কর এবং সদকা কর।’ -সহীহ মুসলিম, হাদীস নং১৯৭১

কুরবানীর পশুর গোশত-চামড়া দ্বারা কসাইয়ের পারিশ্রমিক দেওয়া না জায়েজ:
আলী ইবনে আবী তালিব রা. বলেন-
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর (কুরবানীর উটের) আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করতে বলেছিলেন। তিনি কুরবানীর পশুর গোশত, চামড়া ও আচ্ছাদনের কাপড় ছদকা করতে আদেশ করেন এবং এর কোনো অংশ কসাইকে দিতে নিষেধ করেন। তিনি বলেছেন, আমরা তাকে (তার পারিশ্রমিক) নিজেদের পক্ষ থেকে দিব। -সহীহ মুসলিম, হাদীস নং১৩১৭; সহীহ বুখারী, হাদীস নং১৭১৬
সামর্থ্যবান কি কুরবানী থেকে বিরত থাকতে পারবে?
ছাহেবে নেসাবের উপরই কেবল আল্লাহ কুরবানী ওয়াজিব করেছেন।
যার সামর্থ্য নেই তার উপর তো কুরবানী ওয়াজিব নয়। আর অর্থ-সামর্থ্য তো আল্লাহ দান করেন। আল্লাহর দেওয়া সম্পদ থেকেই তো আমরা কুরবানী করি। এটি তাঁর দানের শুকরিয়া। এখন সামর্থ্য থাকার পরও যদি কোনো মুসলিম কুরবানী না করেন সেটা হবে আল্লাহর দানের নাশোকরি। এর পরিণাম ভয়াবহ। এজন্যই কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন দয়ার নবী। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে। -সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং৩১২৩; সুনানে দারাকুতনী, হাদীস নং৪৭৪৩
একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানী করব:
যাকে আল্লাহ কুরবানী করার তাওফীক দিয়েছেন তার উচিত একমাত্র আল্লাহকে রাজি-খুশি করার উদ্দেশ্যে কুরবানী করা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
অর্থঃ আল্লাহর কাছে না পৌঁছে তাদের (কুরবানীর পশুর) গোস্ত আর না তাদের রক্ত, বরং তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়াই পৌঁছে। -সূরা হজ্ব (২২) : ৩৭
সম্মানিত পাঠক বৃন্দ-
সর্বদিক থেকে ধেয়ে আসছে মহামারী ও গজব
 কখনো ঘুর্নীঝড়, ভূমি কম্প, বন্যা সহ বর্তমানে চলছে করোনা ভাইরাস নামক মহা-গজব যা আমাদের পাপের ফসল।
এ মহা সঙ্কট থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর দরবারে তাওবা ইস্তেগফারের বিকল্প নেই।
অতএব,
আসুন সকলেই গোনাহ থেকে বেঁচে থেকে এ মাসের সম্মান রক্ষা করি। নেক আমলের মাধ্যমে এ মাসের যথাযথ কদর করি। তাকবীর-তাসবীহ-যিকিরে প্রাণবন্ত করি এ মাসকে।
তাওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে ধন্য হই ক্ষমা লাভে। একমাত্র আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য হজ্ব-কুরবানীসহ বেশী বেশী নেক আমল করি।
মহান আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন- আমীন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হাফেজ মাহমুদকে দেখতে 75000 টাকা নিয়ে হাসপাতালে জননেতা শহিদুল ইসলাম বাবুল

চিকিৎসাধীন হাফেজ মাহমুদ এখন বাড়িতে কেন?

ইমামের টাকা আত্মসাৎ করার প্রতিবাদ করায় চাকরি গেল ইমামের।

নগরকান্দায় গ্রাম্য কাইজায় মাদ্রাসায় হামলা"